সূরা আল বাকারা – আয়াত নং: ১৪৩

অর্থাৎ এই আখেরী যামানায় যেমন অন্যান্য সকল দিকের পরিবর্তে কেবল কাবার দিককে কিবলা হওয়ার মর্যাদা দান করেছি এবং তোমাদেরকে তা মনে-প্রাণে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছি, তদ্রূপ আমি অন্যান্য উম্মতের বিপরীতে তোমাদেরকে সর্বাপেক্ষা মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ উম্মত বানিয়েছি (তাফসীরে কাবীর)। সুতরাং এ উম্মতকে এমন বাস্তবসম্মত বিধানাবলী দেওয়া হয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার সঠিক দিক-নির্দেশ করতে সক্ষম। এ আয়াতে মধ্যপন্থী উম্মতের এ বিশেষত্বও বর্ণনা করা হযেছে যে, কিয়ামতের দিন এ উম্মতকে অন্যান্য নবী-রাসূলের সাক্ষী হিসেবে পেশ করা হবে। বুখারী শরীফের এক হাদীসে এর ব্যাখ্যা এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন পূর্ববতী নবীগণের উম্মতের মধ্যে যারা কাফির ছিল, তারা তাদের কাছে নবী-রাসূল পৌঁছার বিষয়টিকে সরাসরি অস্বীকার করবে, তখন উম্মতে মুহাম্মাদী নবীগণের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে, তাঁরা নিজ-নিজ উম্মতের কাছে আল্লাহ তাআলার বার্তা পৌঁছে দিয়ে রিসালাতের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন। যদিও আমরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী দ্বারা অবগত হয়ে এ বিষয়টা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর তাঁর কথার উপর আমাদের বিশ্বাস আমাদের চাক্ষুষ দেখা অপেক্ষাও দৃঢ়। অপর দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের এ সাক্ষ্যকে তসদীক করবেন। কোনও কোনও মুফাসসির উম্মতে মুহাম্মাদীর সাক্ষী হওয়ার বিষয়টাকে এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, এ স্থলে সাক্ষ্য (শাহাদাত) দ্বারা সত্যের প্রচার বোঝানো উদ্দেশ্য। এ উম্মত সমগ্র মানবতার কাছে সত্যের বার্তা সেভাবেই পৌঁছে দেবে, যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পৌঁছিয়েছিলেন। আপন-আপন স্থানে উভয় ব্যাখ্যাই সঠিক এবং উভয়ের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্বও নেই। (মধ্যপন্থী হওয়ার অর্থ এমন সরল পথের অনুসারী, যাতে কোনও রকম বক্রতা নেই। অর্থাৎ যার বিধানাবলী সব রকম প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত এবং নরম ও চরমের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত -অনুবাদক)।

অর্থাৎ আগে কিছু কালের জন্য যে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য- কে কিবলার প্রকৃত রহস্য অনুধাবন করত আল্লাহ তাআলার হুকুম তামিল করে আর কে বিশেষ কোন কিবলাকে চির দিনের জন্য পবিত্র গণ্য করে ও আল্লাহর পরিবর্তে তারই পূজা শুরু করে দেয়, এটা পরীক্ষা করা। বস্তুত ইবাদত বায়তুল্লাহর নয়; বরং আল্লাহ তাআলারই করতে হবে। অন্যথায় মূর্তি পূজার সাথে এর পার্থক্য কী থাকে? মূলত কিবলা পরিবর্তন দ্বারা এ বিষয়টি পরিষ্কার করে দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল। পরবর্তী বাক্যে আল্লাহ তাআলা এটাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, যারা শত-শত বছর ধরে বাইতুল্লাহকে কিবলা মেনে আসছিল হঠাৎ করে তাদের পক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফেরানো সহজ বিষয় ছিল না। কেননা যেসব আকীদা-বিশ্বাস শত-শত বছর মনের উপর কর্তৃত্ব করেছে হঠাৎ করে তা পাল্টে ফেলা কঠিন বৈকি! কিন্তু যাকে আল্লাহ তাআলা এই বুঝ দিয়েছেন যে, সত্তাগতভাবে কোনও জিনিসেরই কোনও মর্যাদা ও পবিত্রতা নেই, প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহ তাআলার হুকুমের, তাদের পক্ষে কিবলার দিকে মুখ ফেরানোতে এতটুকু কষ্ট হয়নি। কেননা তারা চিন্তা করছিল, আমরা আগেও আল্লাহর বান্দা ও তাঁর হুকুমবরদার ছিলাম আর আজও তার হুকুমই পালন করছি। (পিছনে ফিরে যাওয়ার অর্থ রাসূলের আদেশ অমান্য করে কুফরের দিকে ফিরে যাওয়া। আর তাঁর আদেশ মানা হল সম্মুখপানে তথা ঈমানের দিকে অগ্রসরতা -অনুবাদক)।

অন্যান্য ব্লগ